• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০৭:৫১ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

ঘুরে এলাম নীলগিড়ি

Reporter Name / ৭০৫ Time View
Update : সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মেঘ করেছি জয়
অলিউর রহমান খান (রাজিব)

ঢাকার বনানীর আমার অফিস ডেলকট লিমিটেডের পক্ষ থেকে ফ্যামিলি ট্যুর ছিলো বান্দরবানে। তিনদিনের সফরের তৃতীয় দিন নির্ধারিত ছিলো নীলগিড়ি ভ্রমণ। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি ছিল অগ্রহায়নের ২৮ তারিখ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ এবং ১২ ডিসেম্বর ২০১৪ সাল, শুক্রবার। বান্দরবান শহরের হোটেল হিল ভিউ থেকে আমরা ৪৪ জনের একটি টিম ভোর ৬ টায় রওয়ানা হলাম মেঘ পাহারের স্বর্গ রাজ্য নীলগিড়ির উদ্দেশ্যে। বান্দরবান শহর থেকে ৪৮ কিলোমিটার দুরে থানচি উপজেলায় অবস্থিত নীলগিড়ি যেতে হলে আমাদের পাহাড়ী উঁচু নীচু রাস্তা বেয়ে উঠতে হবে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ২৪০০ ফিট উচ্চতায়। তাই আমাদের সবার মাঝেই দেখতে পাচ্ছিলাম দারুন এক উত্তেজনা বিরাজ করছে যা ফুটে উঠেছিলো সবার চোখে মুখে। নীলগিড়ি ভ্রমণে আমরা চান্দের গাড়ি বলে খ্যাত তিনটি খোলা জিপ ৪০০০ টাকা করে ভাড়া করে ছুটছিলাম আর লক্ষ্য করছিলাম প্রচন্ড শীতে আমাদের সবার অবস্থা অনেকটা জড়োসরো। কিছুদুর এগিয়ে আস্তে আস্তে উপরের দিকে উঠার পর লক্ষ্য করলাম আমরা সবাই মেঘের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। মেঘ ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাদের। সে এক অন্য রকম অনুভুতি। হঠাৎ খেয়াল করলাম আমার জ্যাকেট বেয়ে পানি ঝড়ছে। পাশে বসা আমার কলিগ সঞ্জীব দা কে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, মেঘ আপনাকে ভিজিয়ে দিয়ে গেছে রাজিব ভাই। আমার নীল রংয়ের সানগ্লাসটিও একদমই ভিজে গেলো। কয়েক কিলোমিটার যাবার পর চোখে পড়লো শৈল প্রপাত, চিম্বুক পর্বত। পথে পেয়ে গেলাম উপজাতিদেও তৈরী হাতে তৈরী শাল, হরেক রকমের ফল। এবার আমরা নীলগিড়ির যাত্রাপথের প্রায় অর্ধেক পথ চলে এসেছি। দেখতে পাচ্ছি সাদা মেঘের ভেলা ভেসে যাচ্ছে। মহান সৃষ্টিকর্তার কি অনবদ্য সৃষ্টি। মহান আল্লাহর কাছে অনেক অনেক শুকরিয়া আদায় করছি এরকম একটি অপরুপ দৃশ্য দেখতে পেরে। আমাদের গাড়ি ছুটে চলছে নীলগিড়ির পথে। নানা ধরনের চমকপ্রদ তথ্য দিয়ে আমাদের সফরকে আরও প্রাণবন্ত করে রাখছিলো আমাদের গাড়ির হেলপার ইসহাক। যাওয়ার পথে চোখে পড়লো উপজাতি মহিলাদের। কাঁধে সুন্দর একটি ঝুড়ি নিয়ে যাচ্ছে জীবিকার সন্ধানে। নারিকেল, কলা পেপের মত বিভিন্ন ধরণের পরিচিত গাছের পাশাপাশি দেখতে পাচ্ছি অনেক অপরিচিত গাছ । এরমধ্যে আমরা চলে এসেছি নীলগিরিতে প্রবেশের চেকপোস্টের কাছে। ও জানাতে ভুলে গেছি নীলগিড়ি রিসোর্ট বাংলাদেশ সেনা বাহিনী পরিচালিত একটি রিসোর্ট। তাই এখানে আসতে হলে সব যাত্রীদের নাম এন্ট্রি করে তারপর অনুমতি নিয়ে যেতে হয়। যাইহোক, আমার আরেক কলিগ সাইদুল ভাই গাড়ি থেকে নেমে চেকপোষ্টে গিয়ে সবার নাম দিয়ে আসলো। সাথে ছিলো আমাদের গাড়ি চালক। সাইদুল ভাই এসে জানালো চেকপোষ্ট থেকে বলা হয়েছে এরপর থেকে খুব সাবধানে গাড়ি চালাতে হবে। কারণ এই পথে নাকি প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটে। কথার সত্যতা পেলাম কিছুদুর এগুনোর পরই।

আমাদের হোটেল থেকেই অন্য আরেকটি টিম রওয়ানা দিয়েছিলো আমাদের কিছুক্ষণ আগে। এসে দেখলাম তাদের গাড়িটি দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে তবে তেমন বড় কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তখন সকাল প্রায় আটটা। আমরা এবার নীলগিড়ির বেশ কাছাকাছি। পাহাড়ের গা বেয়ে পিচঢালা মসৃন পথে আমরা এগিয়ে চলছি শুভ্র মেঘকে নিচে ফেলে। কখনো ওপরের দিকে উঠতে হচ্ছে আবার একটু নামতে হচ্ছে। আমার বার বার মনে পড়ে যাচ্ছিলো ২০০৯ সালে দার্জিলিং সফরের কথা। ঐ যাত্রাপথও এরকমই ছিলো।
এবার আমরা সবাই দলগত ভাবে গান গাচ্ছি। দারুন উত্তেজনার উন্মুখ আমরা। আমাদের গাড়ির হেলপার কাম ট্যুরিস্ট গাইড ইসহাক জানালো ঐ যে দেখেন নীল গিড়ি দেখা যাচ্ছে। সবাই তার কথা শোনার পর গাড়ির ভেতরেই দাঁড়িয়ে গেলাম। হ্যাঁ সত্যিই আমরা নীলগিড়ির একেবারেই সন্নিকটে। সবাই ক্যামেরায়, মোবাইল ফোনে ছবি তুলতে তুলতে টের পেলাম আমাদের গাড়ি থেমে গেলো। ও তার মানে আমরা এখন নীলগিড়ি হিল রিসোর্টের গাড়ি রাখার পার্কিংয়ে। আমার পাশে বসা ডেভিড ভাইকে নিয়ে আমি নীলগিড়ির মাটিতে পা রাখলাম। ঠান্ডার সমস্যার কারণে গাড়ির ড্রাইভিং সিটের পাশে বসা ছিলো আমার স্ত্রী তানিয়া ও মেয়ে জায়না। ওদেরকেও নামালাম। নেমেই বুক ভরে মেঘ পাহাড় ও সবুজের সংমিশ্রনে তৈরী বাতাসের নির্ভেজাল ও প্রাকৃতিক এক জুস গ্রহন করলাম। ও সত্যিই এত সুন্দর জায়গা বাংলাদেশে আছে! ইংরেজিতে ওয়াও শব্দটি সবার মুখ থেকেই তখন বের হচ্ছিল। আমাদের আইটি অফিসার সাইদুরতো রীতিমত ওয়াও, চার্মিং, মারভেলাস, ওয়ান্ডারফুল শব্দ ছাড়া আর কিছুই বলছেনা। নীলগিড়ি পৌঁছুতে আমাদের সময় লাগলো প্রায় দু’ঘন্টা। এবার সকালের নাশতা সাড়ার পালা। আমরা বান্দরবান থেকেই প্যাকেট নাশতা নিয়ে গিয়েছিলাম। ডাল,ডিম,পরোটা আর চা দিয়ে নাশতা শেষ করলাম সবাই। এরপর ফটোসেশনের পালা। ৫০ টাকার প্রবেশ টিকেট কেটে আমরা সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই দেখতে পেলাম মেঘের সমুদ্র এখন আমাদের চোখের সামনে। এত সুন্দর দৃশ্য আমি এর আগে উপভোগ করিনি। সাদা মেঘগুলো যেন সাদা বরফের পাহাড় মনে হচ্ছিল। সাদা তুলার মত লাগছিলো মেঘের সমুদ্রকে। মনে হচ্ছিলো সম্ভব হলে ঢাকায় নিয়ে যাই ব্যাগ ভরে।

নীলগিড়ি নাম শুনে হয়তো ভাবতে পারেন জায়গাটির নামই নীলগিড়ি কিন্তু আসলে তা না। এটি আসলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে পরিচালিত একটি হিল রিসোর্ট যার নাম নীল গিড়ি হিল রিসোর্ট। এই রিসোর্টে পাঁচ ধরণের কটেজ আছে। আকাশনীলা, মেঘদুত, নীলাঞ্জনা, মারমা রিসা, তেহখো এবং সাথে আছে তাবু টানানো ঘর। মোট আটটি কটেজের মধ্যে একেকটিতে এক রাত্রি যাপনের জন্য ভাড়া পড়বে ৫০০০ থেকে ১২০০০ টাকা পর্যন্ত। আর তাবুতে থাকতে গেলে ২৫০০ টাকা। বাংলাদেশী পর্যটকদের রিসোর্ট বুকিং দিতে হলে তাদের পরিচিত থাকতে হবে বাংলাদেশ আর্মির কোন অফিসার। তারপর অনলাইনে (যঃঃঢ়://হরষমরৎরৎবংড়ৎঃ.পড়স/) এই ওয়েব সাইটে ফরম পূরন করে বুকিং দিতে হবে। আর বিদেশী পর্যটকদের জন্য এই রিসোর্টটি রেস্ট্রিকটেড বা নিয়ন্ত্রিত। এখানে আরও আছে একটি উন্নতমানের রেস্টুরেন্ট, আছে হেলিপ্যাড। বছরের বেশিরভাগ সময়ই এখানে মেঘ দেখা যায়। তবে বর্ষাকালে নীলগিড়ির রুপ হয় অন্যরকম। তখন এর সৌন্দর্য আরও বহুগুন বেড়ে যায়। আমরা নীলগিড়ির বিভিন্ন স্পট ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম আর ছবি তুলছিলাম। এখানে আসার পর আমার মনে হলো দার্জিলিংয়ের চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর আমাদের নীলগিড়ি। যারা এখনো যাননি তারা এর স্বাদ নিতে ঘুরে আসুন স্বপরিবারে। একবার গেলে যে কেউ আবার যাবে এটা আমার মনে হচ্ছে। আমার বিশ্বাস সরকার ও সেনাবাহিনীর বিশেষ উদ্যোগে এই অপূর্ব মনোরম সুন্দর স্থানটি একসময় বিশ্বের অন্যতম ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে দেশী বিদেশী পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষন করবে। প্রায় দু’ঘন্টা অবস্থান শেষে এবার আমাদের ফেরার পালা। মেঘ পাহাড়কে বিদায় জানিয়ে আমরা ফিরতি যাত্রা শুরু করলাম বান্দরবান শহরের উদ্দেশ্যে। আর কানে কানে নীলগিড়িকে বললাম বন্ধু খুব তারাতারিই তোমার সাথে আবার দেখা হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd